খবরদার বাইরে যাবে না। জানো তো এখানে নদীতে কুমির আর ডাঙায় বাঘ।
বন লাগোয়া রেস্ট হাউজ। অদূরে সমুদ্র। সকালে লঞ্চ থেকে নেমেই বাবা একই কথা কানে জপছেন।
আসলে সুন্দরবনের কিছুই জানে না সে। মন্টুমামার কাছে কিছু গল্প শুনেছে অবশ্য। মাহিন স্যারের খুব ইচ্ছে ছিল স্কুল থেকে সবাইকে নিয়ে সুন্দরবন যাবেন। কিন্তু করোনার কারণে সব আটকে যায়।
তবে এবারের ঘটনাটা অন্য রকম।
ফাইনাল পরীক্ষা শেষ।
স্কুল নেই। পড়া নেই। কোচিংয়ের তাড়নাও বন্ধ হয়েছে
শুধু খেলে আর সময় কাটে না।
তাদের একটা ক্রিকেট দল আছে। দলের নাম ইয়ং টাইগার। মোহন ভাই ক্যাপ্টেন। দৌলতপুরের ব্লু স্টারের সঙ্গে খেলে এসেছে গত সপ্তায়। মারকুটে ব্যাটসম্যান হিসেবে তার একটু নাম হয়েছে। শচীনের খেলার ধার আছে নাকি তার ব্যাটে। সে অতো বোঝে না। তার আসলে ভালো লাগে মেসিকে।
খেলার সময়টুকু ছাড়া ঘরেই শুয়ে বসে কাটছে তার। মাঝে মাঝে পল্টুকে নিয়ে উমেশচন্দ্র লাইব্রেরিতে যায়। রহস্য আর গোয়েন্দা বইগুলো খুব টানে। শিকার কাহিনিও পড়তে মন্দ লাগে না।
জিম করবেটের চিতা শিকারের ঘটনা গায়ের রক্ত হিম করে দেয়।
শিকারের রোগটা মোটামুটি এখান থেকেই মাথায় চেপেছে।
তাই বলে সেটা করবেট সাহেবের মতো রাইফেল বন্দুক নিয়ে নয়।
সে এমনিতে ভারি ভয়কাতুরে। ওসব বাঘ ভালুক তার সইবে না।
তার নেশা ধরেছে শিকার কাহিনির বইগুলো পড়া। জিম করবেট কেমন যেন গুলিয়ে দিয়েছে মাথাটা।
মন্টু মামাকে কথাটা বলতেই নাক সিটকে বলল, ‘রাখ তোর করবেট। লাল চামড়া বলে বেটার এতো খাতির। ও পারবে আমাদের সুন্দরবনের মেহের আলির সঙ্গে?’
সুন্দরবনের বাঘের গল্প সে কিছু কিছু শুনেছে মামার মুখে। তবে পচাব্দী গাজীর সুন্দরবনের মানুষখেকো বইটা পড়ে একদম তাক লেগে গেছে।
মামাকে সে কথাটা বলতেই একটু খুশির আভা ফুটে উঠল ঠোঁটে।
‘অ, পড়েছিস তাহলে! তোর বাপ তো কাউকে পাত্তা দিতেই রাজি না। ওনার ধারণা বাঙালি হলো ভীতুর ডিম। ওসব হলো গালগল্প।’
‘তুমি বাঘ দেখেছ মামা?’
‘দেখব না কেন? কতবার সুন্দরবন গেলাম। চাঁদুদের শুধু দূর থেকেই দেখলাম। মুখোমুখি পেলাম না একবারও। আমার বন্দুকের টিপ তো জানিস। খুলি উড়িয়ে দেব না!’
‘ওরে বাবা, কী সাহস তোমার!’
‘সাহসের কী দেখলি! একবার মতিকাকু আর একজন শিকারি নিয়ে গেলাম সুন্দরবনে। তখন কতোইবা আর বয়স! শিকারি লোকটা ছিল বেজায় সাহসী। ওনার মুখে শুনেছিলাম মেহের গাজীর নাম।
মেহের বনে উঠলে বাঘ ভয়ে পালাতো। কিন্তু পালাবে কোথায়?
ওদের পায়ের নিশানা ধরে ধরে চলে যেত গহিন বনে।
পথে বন্দুকের ফাঁদ পেতে বসে থাকতো মেহের।
বাঘ যে পথে যায় সেই পথে আসে। আর ফাঁদে পা দিলেই ফটাস। ঠ্যাং উল্টে কোঁত মেরে পড়ে বাবাজিরা।
মেহের মুখোমুখিও লড়েছে।
একবারতো লড়তে গিয়ে মরতে বসেছিল প্রায়।
হাতে বড়ো ক্ষত হয়ে রক্তারক্তি হয়েছিল।
বুড়ো মেহের অচল হলেও থেমে থাকেনি। শিকারের নেশা ভারি নেশা।
রোগশোক নিয়েও অস্থির হয়ে পড়ে মানুষটা।
সবাই হা হা করে ওঠে।
এরকম বুড়ো-হাবড়া শরীর নিয়ে যাবে বাঘ শিকারে? এ কী ঘরের বেড়াল নিয়ে খেলা!
পাগল হয়ে যায়নি তো বুড়োটা।
সবাই বাধা দিয়েও ঠেকাতে পারল না তাকে।
রক্তে যার বান ডেকেছে তাকে আগলে রাখা সহজ নয়।
আধমরা শরীর নিয়ে বনে হাজির হলো এককালের পিলেকাঁপানো শিকারি মেহের।
সবার চোখ ছানাবড়া। কী হতে কী হয়ে যায় বলা যায় না।
শেষ বয়সে কী আছে বুড়োটার কপালে কে জানে!
আধাভাঙা শরীর নিয়ে হুঙ্কার দিয়ে ওঠে মেহের।
তার শরীরে যারা রক্ত ঝরিয়েছে তাদের সহজে ছাড়বে না। হোক না শরীরে তাকত কম। তাতে কী হয়েছে?
মরার আগে একটা প্রতিশোধ নিয়ে যাবে। যা স্মরণীয় হয়ে থাকবে সুন্দরবনের ইতিহাসে।
হয়েও ছিল তাই।
মেহের গাজী কাহিল শরীর নিয়ে দুই-দুটো বাঘ মেরে পুরস্কার পেয়েছিল সরকারের কাছ থেকে।
সবাই ধন্য ধন্য করে উঠল মেহেরকে নিয়ে।
মামা কিছু সময় চোখ বন্ধ করে থেকে বললেন, ‘কিরে বুঝলি কিছু! তোদের করবেট সাহেব ভারতের বনদাউড় থেকে এক আধটা ইঁদুর মেরে মাটিতে আর পা পড়ে না! দুমদাম লিখে ফেললেন কয়েকখানা বই। আর কী! ঢোলের বাড়িতে নাম ফেটে গেল চারদিকে। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বল, তোর করবেট বড়ো, নাকি আমাদের মেহের গাজী?’
‘পচাব্দী গাজীর নাম তো বললে না!’
‘ও আর কী বলব! চেনা বামুনের পৈতা লাগে না।’
‘তবুও বলোই না।’
‘পচাব্দী হলো মেহেরের ছেলে। সেও বড়ো শিকারি। বাপের মতো নামডাক।’
‘উনিও বাঘ মেরেছেন নাকি?’
‘মারেনি মানে! বনে ওর চাকরিটাই তো ছিল মানুষখেকো মেরে তাড়ানো।’
‘তা তোমার বাঘ শিকারের কী হলো মামা?’
‘কী আর হবে! মতি কাকু আর শিকারি মিলে রাতেই নৌকা নিয়ে চলে গেলাম বনে। সরু খাল। ভাটিতে খাল শুকিয়ে বনের মাঝে আটকে গেছে নৌকা। ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছুই ঠাহর করা যাচ্ছে না। ওদিকে বাঘের হুঙ্কারে বনবাদাড় কাঁপছে থর থর করে। ভয়ে কিচ কিচ করে ছোটাছুটি করছে বাঁদরের দল। একটানা ঝিঁঝিঁর ডাকে কানে তালা লেগে যাচ্ছে। কী একটা পাখি ডানা ঝাপ্টে উড়ে গেল ছর ছর করে। নৌকায় ভয়ে মরছি আমরা। এই বুঝি চুপি চুপি এসে হামলে পড়ে বাঘ! মতি কাকু দোনলা বন্দুক তাক করে বসে থাকেন ছইয়ের তলায়। শিকারি চারদিকের ভাবসাব দেখে বলল, চলেন নামি। হরিণের খাওনের সময় হইছে।
মতি কাকু পাকা শিকারি। রাত-বিরেতে বহু শিকার করেছেন সুন্দরবনে। কিন্তু আজ কেমন যেন তাকে একটু শঙ্কিত মনে হলো।
শিকারির কথায় মাথা নেড়ে বললেন, না, এখন আর নেমে কাজ নেই। জায়গাটা সুবিধার মনে হচ্ছে না। ভোর হোক। সাতসকালে গাছে চড়লে হবে। অপেক্ষা করা ভালো। জোয়ার হলেই ওরা পানি খেতে নামবে। আপনারা এখন ঘুমোন। আমি বন্দুক নিয়ে জেগে থাকি। পরে আমি ঘুমোলে আপনি গলুইতে বসবেন।
আমিও বাবার বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে এসেছি। দু’একটা বকটক মেরে হাত পেকেছে সামান্য।
কিন্তু কাকুদের গালগল্প শুনে শুনে আমারও খায়েশ চেপেছে বাঘ শিকারের।
ওসব হরিণ-টরিণ মেরে হাত গন্ধ করে লাভ নেই।
শুনেছি গুলি খেয়ে হরিণ চোখ ছর ছর করে কেঁদে দেয়। আমি বাপু ওসবে নেই। মারি তো গণ্ডার, লুটিতো ভান্ডার। এসেছি যখন বাঘ মেরেই যাব।
কাঁথার ভেতর লুকিয়ে থেকেও হাতের কাঁপন থামাতে পারছিলাম না। ওদিকে হালুম হালুম ডাকে বনজঙ্গল কেঁপে থরথরিয়ে উঠছে। নৌকার হাঁড়িপাতিলগুলো ঝনঝনিয়ে দুলে ওঠে বাড়ি খাচ্ছে কেবল।
বন্দুকটা বুকে চেপে ধরে আছি।
একনলা হলে কী হবে! ভারি তেজ। ফ্রান্সের সিম্পলেক্স গান বলে কথা। সবাই হাতে নিয়ে মাথা নাড়ে। দেখে সুখ। মেরেও সুখ।
বাবা কী মনে করে যেন বন্দুকটা তুলে দিলেন আসার সময়। সঙ্গে অনেকগুলো রেমিংটনের এলজি গুলি। ছররাও ছিল কিছু। ওটা রাখতে হয় বলে রাখা। আমিতো বাপু সুন্দরবনে বক মারতে আসিনি।
এদিকে হালুম হুলুমের কাঁপুনিতে এলজি ভুলে বক মারা ছররা ঢুকিয়ে একটু শক্তি এলো মনে। আসুক না বেড়ালের বংশ। ঝেড়ে ফেলে দেব না।
এবারের হালুম ডাকটা মনে হলো একদম কানের কাছে।
নৌকাটা দুলে উঠল অস্বাভাবিকভাবে।
শিকারি ফিসফিসিয়ে বলল, লক্ষণ ভালো না। সাবধান।
শুকনো খালে নৌকাটা মিশে আছে দুই তীর ঘেঁষে।
দূর থেকে বাঘ টের পায় মানুষের গন্ধ। এমন শিকার পেলে তারা কি সহজে ছেড়ে দেবে!
মতি কাকুর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
শিকারি অভয় দিয়ে বলল, রাত পোহানোর বেশি বাকি নাই। চলেন গাছে উঠে বসি। খোকা নৌকায় থাকুক।
না, না, আমিও যাব।
আহা, থাকতে বলছে থাক না। মাঝি তো আছে। ভয় কী?
আমিও গাছে উঠব বন্দুক নিয়ে।
এই সেরেছে তুই কি গাছে উঠতে পারিস।
না, পারি না। দেখিয়ে দিলে ঠিকই পারব।
মতিকাকু রীতিমতো বিরক্ত, তুই কেন এসেছিস বলতো?
বাঘ মারতে এসেছি।
খুব ভালো, একটা বক মেরে এতো সাহস!
আপনারা ঘুমান। আমি বন্দুক নিয়ে পাহারা দিই।
শিকারি কুলকুলিয়ে হেসে উঠল, চলো খোকা তুমি আর আমি গিয়ে বাঘ মেরে আসি। ঘুমিয়ে থেকে কী হবে!
তাই যান।
মতি কাকু ফুড়ন কেটে কোল ভাঁজ হয়ে সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়লেন।
একটু মন খারাপ হয়ে গেল। কেউ তাকে খুব একটা আমলে আনছে না।
ফরেস্টারের অফিসে পাস নিতে গিয়েও এমনটা হয়েছিল।
ফরেস্টার হেসে বলেছিলেন, কী খোকা তুমিও শিকারি নাকি! তা কী শিকার করবে? বাঘ না ভালুক!
মানুষটা হাসিখুশি স্বভাবের। নতুন চাকরি। বনবাদাড়ে মন টিকছে না।
বই পড়ে আর গান শুনে সময় কাটে।
আড্ডা জমাতে তাদের রাতে রেখে দিলেন বাংলোতে।
মতিকাকু না না করেও লাভ হলো না।
রাতের খানাপিনা শেষে জমে উঠল আড্ডা। কতো গল্প। ভয়ে শিহরণে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়।
গত মাসেই নাকি গোলপাতা কাটতে গিয়ে বাঘের পেটে গেছে একজন বাওয়ালি।
ছেলেটা অল্পবয়সী। কেবল নতুন বিয়ে করে বউ রেখে এসেছে বাড়িতে।
ওর দলের লোকজন বহু খুঁজেও দিকনিশানা পায়নি।
অফিসের গার্ডকে পাঠিয়েছিলাম রাইফেল নিয়ে। বারকয়েক তালাশ দিয়েও লাভ হলো না। ওর বাপটা উথাল-পাথাল করে কাঁদল কয়েকটা দিন। এই কষ্ট সহ্য হয় না!
আমরাও তো কতো রকম ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাই। কতক্ষণ সতর্ক থাকা চলে?
আগে খুব কষ্ট হতো। ভয়ে ভয়ে থাকতাম এক অজানা আশঙ্কায়।
দিনটা যেমন তেমন, রাতটা একদমই পার হতে চাইত না।
বলতে গেলে পুরো রাতই জেগে বসে থাকতাম।
এই বুঝি বাঘ এলো। ডাকাত এলো। ভূতপেত্নীরও ভারি ভয়।
অদ্ভুত নিঝুম থমথমে চারদিক। একটানা ঝিঁঝিঁর ডাকে কেমন তালা লেগে যায় কানে। হঠাৎ হঠাৎ ডেকে ওঠে দু-একটা রাতজাগা পাখি। বাঁদরের কিচিমিচিরের পাশাপাশি বনজঙ্গল কাঁপিয়ে সহসা ভেসে আসে বাঘের হুঙ্কার।
এ সময় আশ্চর্য এক হাহাকার চেপে বসে মনে। কেবলই প্রশ্ন জাগে এ কোথায় এলাম?
কেন এলাম?
এই বিশাল নির্জনতার ভেতর আমার কোনো অস্তিত্ব আছে কি!
নিজেকে এভাবে খুঁজতে খুঁজতে এক সময় কখন যেন আবিষ্কার করলাম অন্য এক আমিকে।
এখন আর আগের মতো হয় না।
সেই পালাই পালাই ভাবটা কেটে গিয়ে কখন যেন রূপান্তরিত হলাম অন্য মানুষে।
কোনো কিছু নিয়ে এখন আর অভিযোগ নেই। বড়ো আপন হয়ে গেছে সবকিছু। এমনকি ওই যে বাঘের গর্জন- তাতেও কোনো ভাবান্তর হয় বলে মনে হয় না।
ওরা আছে ওদের মতো। কী হবে অতো ভেবে?
আমার তো মনে হয় ওই মানুষখেকো রোজ রাতে এসে দেখে যায় আমাকে।
ও যদি আসলে আমাকে নিয়ে যেতে চায় তবে কি ঠেকানোর কায়দা আছে!
এই বাংলোটা তো এক রকম অরক্ষিত বলা চলে। গার্ড একজন রাইফেল নিয়ে পাহারা দেয় বটে ওটা কোনো কাজের নয়।
বাংলোর বাইরে যে কাঁটাতারের বাউন্ডারি সেটাও কি যথেষ্ট একটা মানুষখেকো ঠেকাতে।
আসলে ওদের জন্য আজকাল খুব মায়া হয় আমার।
ওরা আছে বলেই আমাদের বনটা এখনও টিকে আছে।
জীবজন্তুগুলো এখনো হারিয়ে যায়নি। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় সুন্দরবনে একসময় গন্ডার ছিল।
আজ সব হারিয়ে গেছে মানুষের ভুলে। আমার তো মনে হয় এমন একদিন আসবে একটা বাঘ-হরিণও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সুন্দরবন হারিয়ে যাবে সমুদ্রের পেটে।
মোরেলগঞ্জের মোরেল সাহেব তো কম ক্ষতি করেননি এই বনের। সুন্দরবন লিজ নিয়ে ৬০ হাজার বিঘা জমি আবাদ করেছিলেন মোরেল। বন সাফ করতে বহু লোক এসেছিল বরিশাল থেকে। এরা এখন পাকাপাকি বসত গেড়েছে আশপাশের গ্রামে।
হয়ত গোটা খুলনাটাই একদিন ছিল সুন্দরবনের পেটে।
কী না ছিল সুন্দরবনে! বড়ো বড়ো প্রাসাদ, ইমারত, দীঘি, লবণ কারখানা, অস্ত্রাগার কত চিহ্ন ছড়িয়ে আছে সুন্দরবনের সর্বত্র।
আমার খুব ইচ্ছে হয় ওরকম একটা ভাঙাচোরা বাড়িতে গিয়ে থাকি।
শুনেছি সাপকোপ আর বাঘের অভয়ারণ্য হয়ে আছে সেগুলো। হলোই বা। একদিন মানুষ ছিল। এখন জীবজন্তু থাকে। শুধু প্রভেদ এই।
অথচ এই সুন্দরবন নিয়ে কত মিথ। কতই না রূপকথার গল্প।
যে কোনো অজানাকে ঘিরে পাখা মেলে নানা রকম কুসংস্কার।
এখানেও তা আছে। নানা ভাবে আছে।
এই যে বাওয়ালি, জেলে আর মৌয়ালরা বনদেবীকে খুশি করে বনে ঢুকছে এটার কী ভিত্তি আছে?
দুবলার চরে এখন তো এই পুজোটুজো নিয়ে রীতিমতো মেলা বসে গেছে।
কত দূরদূরান্ত থেকে পুণ্যার্থীরা আসছে দলবল নিয়ে।
সাগরে স্নান করে সব পাপতাপ মুছে তারা ফিরে যায় আপন সংসারে।
এই সুযোগের ওত পেতে থাকে অসাধু চোরের দল।
ওরা ফাঁদ পেতে চুরি করে রাজ্যের হরিণ। শুধু মেলাই বা বলি কেন, এই চুরি-চামারি হররোজ চলছে।
কেউ মারছে হরিণ। কেউ কাটছে গাছ। কেউ ঝেড়ে নিচ্ছে গোলপাতা। মৌচাকের মধু। এতো চুষে খেলে আর থাকবে কী!
তারওপর আছে ডাকাতের ত্রাস। ওদের দাপট বাড়ছে তো বাড়ছেই।
আমরা গুটিকয় মানুষ কী করে আগলে রাখব এতো বড়ো বন!
একসময় ভাবতাম আর নয়। অনেক হয়েছে। এবার ফিরে যাই।
কী আছে এই বন বাদাড়ে?
সব কথা বাদ দিই। খাবার পানিটুকু পর্যন্ত টেনে আনতে হয় বাইরে থেকে।
মা বলেন, অতো কষ্ট করে কাজ নেই বাবা। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আয়।
না, আমার আর ফেরা হলো না।
এখন সব সয়ে গেছে। কোনো কিছুর জন্য কষ্ট হয় না।
কী মন্টু সাহেব, তুমি থাকবে নাকি আমার সঙ্গে। তোমার মতো একটা ভাই আছে আমার। খুবই দুষ্টু। ওর খুব শখ একটা বাঘ শিকার করবে। তুমি যেমন চাও তাই না…।