মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের ঘনঘটা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তপ্ত আঞ্চলিক পরিস্থিতি। তবে এই যুদ্ধের ময়দান ছাড়িয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে পেন্টাগনের অস্ত্রের মজুদ। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, লড়াই যদি দীর্ঘমেয়াদী হয়, তবে সংকটে পড়তে পারে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী।
আল জাজিরার এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ইরানের সাথে সরাসরি সংঘাত যদি ১০ দিনের বেশি স্থায়ী হয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডারে টান পড়তে পারে। পেন্টাগন ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে জানিয়েছে যে, এই অভিযান দীর্ঘায়িত হলে কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে, দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া অত্যাধুনিক মিসাইল পুনরায় তৈরি বা সংগ্রহ করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বরাবরের মতোই আত্মবিশ্বাসী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ বর্তমানে ইতিহাসের সেরা অবস্থানে রয়েছে। আমাদের সরবরাহ কার্যত সীমাহীন এবং এই শক্তি দিয়ে আমরা যেকোনো যুদ্ধ চিরকাল চালিয়ে যেতে সক্ষম।”
যুদ্ধের ময়দানে ব্যবহৃত মার্কিন সমরাস্ত্র
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যমতে, ইরানে চলমান অভিযানে আকাশ, জল ও স্থলপথে ২০টিরও বেশি অত্যাধুনিক অস্ত্রব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, যুদ্ধবিমান, এফ-৩৫ লাইটনিং II, এফ-২২ র্যাপ্টর এবং বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান। ড্রোন ও মিসাইল, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং টমাহক ক্রুজ মিসাইল। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, থাড (THAAD) এবং প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম। নৌ-শক্তি, ইউএসএস আবরাহাম লিঙ্কন এবং ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড নামক দুটি বিশালাকার বিমানবাহী রণতরী।
কেন এই ঘাটতির আশঙ্কা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেন এবং ইসরায়েলকে টানা সামরিক সহায়তা দিতে গিয়ে মার্কিন অস্ত্রাগারে এমনিতেই চাপ তৈরি হয়েছে। ইরানের সাথে ১২ দিনের গত সংঘাতের উদাহরণ টেনে বলা হচ্ছে, সে সময় মাত্র কয়েক দিনেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের মোট থাড মিসাইল মজুদের প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যবহার করে ফেলেছিল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘর্ষকালে বিপুল পরিমাণ জাহাজভিত্তিক প্রতিরক্ষা মিসাইলও ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জয়েন্ট ডাইরেক্ট অ্যাটাক মিনিশন (JDAM)—যা জিপিএস-নির্দেশিত কিটের মাধ্যমে সাধারণ বোমাকে নির্ভুল ‘স্মার্ট’ অস্ত্রে রূপান্তরিত করে।
স্টিংমন সেন্টারের ফেলো ক্রিস্টোফার প্রেবল মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্য অঞ্চল (যেমন ইন্দো-প্যাসিফিক) থেকে অস্ত্র এনে অভাব পূরণ করতে পারলেও, তাতে ওইসব অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
যুদ্ধের আকাশচুম্বী ব্যয়
পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে খরচের হিসাব না দিলেও প্রাথমিক অনুমান বলছে, অভিযানের প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার। প্রস্তুতিমূলক কাজেই খরচ হয়েছে আরও ৬৩০ মিলিয়ন ডলার। একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ (যেমন ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড) পরিচালনা করতে প্রতিদিন প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হয়।
লড়াই যদি কেবল শক্তির মহড়া না হয়ে দীর্ঘমেয়াদী ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে’ (War of Attrition) রূপ নেয়, তবে কেবল বীরত্ব দিয়ে নয়, বরং অস্ত্রের উৎপাদন ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রকে এই পরীক্ষার মোকাবিলা করতে হবে।
সূত্র : টাইমস অফ ইন্ডিয়া







