আল্লাহ তাআলার এক নাম ‘আল-ওয়াহহাব’ বা মহাদাতা। তাঁর ভান্ডারে কোনো কমতি নেই এবং তিনি তাঁর বান্দাদের দান করতে ভালোবাসেন। ইসলামের সাধারণ বিধান হলো, বান্দা একটি নেক আমল করলে আল্লাহ তার বিনিময়ে কমপক্ষে দশ গুণ সওয়াব দান করেন। আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি একটি সত্কর্ম নিয়ে আসবে, তার জন্য থাকবে তার দশ গুণ প্রতিদান। (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৬০)
কিন্তু হাদিস শরিফে এমন কিছু বিশেষ আমল ও পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বান্দার কষ্ট, ত্যাগ এবং দ্বিমুখী দায়িত্ব পালনের কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে সাধারণের চেয়ে আলাদা মর্যাদা দেন এবং দ্বিগুণ সওয়াব দান করেন। এই আমলগুলো মুমিনের আখেরাতের ঝুলি ভারী করার এক সুবর্ণ সুযোগ।
নিচে এমন কিছু আমল নিচে আলোচনা করা হলো, যার বিনিময় আল্লাহ দ্বিগুণ করে দেন—
১. আত্মীয়-স্বজনকে দান করা
সাধারণ কোনো মিসকিন বা গরিবকে দান করলে কেবল সদকার সওয়াব পাওয়া যায়। কিন্তু নিজের গরিব আত্মীয়-স্বজনকে দান করার মর্যাদা অনেক বেশি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মিসকিনকে দান করা হলো সদকা। আর আত্মীয়কে দান করা হলো দুটি আমল, ১.সদকা এবং ২.আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০০০)
সুতরাং, দানের ক্ষেত্রে আপন ভাই-বোন, চাচা-ফুফু বা নিকটাত্মীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়া বুদ্ধিমান মুমিনের কাজ। এতে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করা যায়।
২. কষ্ট করে কোরআন তিলাওয়াত করা
অনেকে আছেন যারা কোরআন পড়তে গিয়ে তোতলামি করেন বা আটকে যান। সাবলীলভাবে পড়তে পারেন না বলে মন খারাপ করেন। অথচ তাদের জন্যই রয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে সুসংবাদ। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআনে দক্ষ, সে সম্মানিত ফেরেশতাদের সঙ্গী হবে। আর যে ব্যক্তি কোরআন পড়ে এবং তোতলায় (অর্থাত্ পড়তে খুব কষ্ট হয়), তবুও চেষ্টা চালিয়ে যায়, তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৯৩৭)
এখানে একটি সওয়াব তিলাওয়াতের জন্য, আর দ্বিতীয় সওয়াবটি তার এই কঠোর প্রচেষ্টার জন্য।
৩.আল্লাহর হক ও মালিকের হক আদায়কারী
কর্মজীবনে যারা সততা বজায় রাখেন, তাদের জন্যও রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার। যে কর্মচারী, শ্রমিক বা অধীনস্থ ব্যক্তি নিজের মালিকের অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে এবং একইসাথে আল্লাহর ইবাদত ঠিকমতো আদায় করে, আল্লাহ তার প্রতি অত্যন্ত্ম খুশি হন।
হাদিসে এসেছে, ওই ক্রীতদাস বা কর্মচারীর জন্য দ্বিগুণ সওয়াব, যে আল্লাহর হক আদায় করে এবং তার মনিবের বা মালিকের হকও নিষ্ঠার সাথে আদায় করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৪)
৪. আহলে কিতাবের ইসলাম গ্রহণ
পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবের অনুসারী (যেমন ইহুদি বা খ্রিস্টান) কেউ যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে তিনি দ্বিগুণ সওয়াবের অধিকারী হন। হাদিসে এসেছে, আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে মুমিন ব্যক্তি যে তার নবীর প্রতি ঈমান এনেছিল। তারপর নবী (সা.)-এর প্রতি ঈমান এনেছে। তাঁর জন্য দিগুণ সাওয়াব আছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩০১১)
কারণ, তিনি প্রথমত তার নিজের নবীর (মুসা বা ঈসা আ.) ওপর ঈমান এনেছিলেন এবং দ্বিতীয়ত শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর ঈমান এনেছেন। সত্যের সন্ধানে তাদের এই দীর্ঘ যাত্রাকে আল্লাহ দ্বিগুণ প্রতিদান দিয়ে সম্মানিত করেন।
৫. সত্য সন্ধানী বিচারক বা মুজতাহিদ
বিচারক বা আলেম যখন কোনো জটিল বিষয়ে সঠিক সমাধান বের করার জন্য ‘ইজতিহাদ’ বা গভীর গবেষণা করেন এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান, তখন তিনি দুইটি সওয়াব পান। একটি তার গবেষণার কষ্টের জন্য, অন্যটি সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য। আর যদি ভুলও করেন, তবুও তিনি চেষ্টার জন্য একটি সওয়াব পান। এটি ইসলামের জ্ঞানচর্চার প্রতি উত্সাহের প্রমাণ।
আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এই কথা বলতে শুনেছেন, কোন বিচারক ইজতিহাদে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে তার জন্য রয়েছে দুটি পুরস্কার। আর যদি কোন বিচারক ইজতিহাদে ভুল করেন তার জন্যও রয়েছে একটি পুরস্কার। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৫৫২)
৬. নবী পত্নী ও নেককার নারীদের বিশেষ মর্যাদা
যাদের আল্লাহ সমাজে উচ্চ মর্যাদা বা দ্বীনি জিম্মাদারি দিয়েছেন, তাদের সওয়াবও আল্লাহ বাড়িয়ে দেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা নবী কারিম (সা.)-এর স্ত্রীদের উদ্দেশ্য করে কোরআনে ইরশাদ করেন, আর তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি অনুগত থাকবে এবং নেক আমল করবে, আমি তাকে তার প্রতিদান বা সওয়াব দুইবার দেব। আর আমি তার জন্য প্রস্তুত রেখেছি সম্মানজনক রিজিক। (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩১)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে দ্বিনের পথে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারকারী নারীদের আল্লাহ বিশেষভাবে সম্মানিত করবেন।
৭. ভালো কাজের সূচনা করা
সওয়াব কেবল দ্বিগুণ নয়, বরং তা হাজার গুণ বা কেয়ামত পর্যন্ত জারি থাকার একটি চমত্কার উপায় হলো কোনো ভালো কাজের সূচনা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো ভালো প্রথা বা রীতির প্রচলন ঘটাবে, সে তার সওয়াব পাবে এবং তার পরে যারা সেই অনুযায়ী আমল করবে, তাদের সওয়াবও সে পাবে; অথচ তাদের সওয়াব থেকে কোনো কিছুই কমানো হবে না। (সহিহ মুসলিম, হদিস : ১০১৭)
অর্থাৎ, কেউ যদি কোনো দ্বীনি প্রতিষ্ঠান, পাঠাগার বা জনকল্যাণমূলক কাজ শুরু করে যান, তবে তিনি নিজে আমল করে যে সওয়াব পাবেন, অন্যরা আমল করার কারণে সেই সওয়াবও তার আমলনামায় যোগ হতে থাকবে। এটি আল্লাহর এক বিশাল রহমত।
কেন এই দ্বিগুণ প্রতিদান?
আমরা লক্ষ্য করলে দেখব, উপরে উল্লিখিত প্রতিটি আমলের সঙ্গে অতিরিক্ত কষ্ট বা দ্বিমুখী দায়িত্ব জড়িত। আত্মীয়কে দান করতে গেলে মনের সংকীর্ণতা দূর করতে হয়। কষ্ট করে কোরআন পড়তে গেলে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। চাকরি ও ইবাদত একসাথে চালাতে গেলে সময়ের কোরবানি দিতে হয়।
আল্লাহ তাআলা ন্যায়বিচারক। তিনি বান্দার এই অতিরিক্ত কষ্টটুকু বিফলে যেতে দেন না। তাই তিনি তাঁর বিশেষ রহমতে এদের সওয়াব দ্বিগুণ করে দেন।







