মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তির একটি বড় দুর্বলতা হলো নিজের ঢোল নিজে পেটানো। সুযোগ পেলেই আমরা নিজেদের গুণগান, সাফল্য আর অর্জনের গল্প শুনিয়ে আত্মতৃপ্তি পেতে চাই। অথচ এই আত্মতুষ্টির আড়ালে যে এক ভয়াবহ আধ্যাত্মিক ব্যাধি লুকিয়ে আছে, তা আমরা অনেকেই উপলব্ধি করি না। সাধারণ মানুষ তো বটেই, অনেক ইবাদতগুজার ব্যক্তিও এই ‘ইখলাস’ বিনষ্টকারী রোগের শিকার হয়ে পড়েন।
নিজের বড়ত্ব জাহির করা বা আত্মপ্রচারে মত্ত হওয়া কোনো সুস্থ মানসিকতার পরিচয় নয়। একজন সচেতন মানুষ কখনোই অন্যের মুখে নিজের প্রশংসা শুনতে বা কাউকে নিজ মুখে বড়াই করতে দেখে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। মজার ব্যাপার হলো, যিনি নিজে আত্মপ্রশংসা করেন, তিনিও কিন্তু অন্যের আত্মপ্রশংসাকে ঘৃণাভরেই দেখেন। এটি শুধু ব্যক্তিত্বকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং মানুষের নেক আমলকেও নিভিয়ে দেয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন:
“তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না (নিজেদের পুণ্যবান দাবি করো না)। কারণ তিনি সর্বাধিক অবগত কে আল্লাহকে ভয় করে।” (সুরা নাজম, আয়াত: ৩২)
একজন নেককার মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো তার অন্তরের অহংকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা যদি পাপ না-ও করো, তবে আমি তোমাদের জন্য এর চেয়েও বড় পাপের আশঙ্কা করি; আর তা হলো আত্ম-অহমিকা।” (সহিহুত তারগিব)
ব্যক্তির নামেও যাতে আত্মপ্রচারের ছোঁয়া না থাকে, ইসলাম সেদিকেও নজর দিয়েছে। নবীজি (সা.) ‘বাররাহ’ (পুণ্যবতী) নামটি পরিবর্তন করে ‘জয়নাব’ রেখেছিলেন, যাতে নামের মাধ্যমে নিজের পবিত্রতা প্রকাশের সুযোগ না থাকে। কারণ, কে প্রকৃত পুণ্যবান তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।
কিয়ামতের ময়দানে অনেক বড় বড় আমলকারী ব্যক্তিও লাঞ্ছিত হবেন শুধুমাত্র এই লোক দেখানো মানসিকতার কারণে। হাদিস শরীফে এসেছে, একজন শহীদকে যখন বিচার করা হবে, তখন জানা যাবে সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয় বরং ‘বীর’ উপাধি পাওয়ার জন্য লড়াই করেছিল। দুনিয়াতে সে সেই সম্মান পেয়ে গেছে, তাই পরকালে তার জন্য থাকবে কেবল জাহান্নাম।
একইভাবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির পাশাপাশি মানুষের সুনাম বা সুখ্যাতি কামনা করে, তার কোনো আমলই আল্লাহ কবুল করেন না। আল্লাহ কেবল সেই কাজটুকুই গ্রহণ করেন, যা একান্তই তাঁর সন্তুষ্টির জন্য এবং নিষ্কলুষ নিয়তে করা হয়।
আত্মপ্রশংসার মূল উৎস হলো অহংকার। আল্লাহ দাম্ভিক ও অহংকারী ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না। সুরা লোকমানে ইরশাদ হয়েছে, “অহংকারবশে তুমি মানুষের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না এবং জমিনে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না।”
বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নিজের প্রতিটি ছোট-বড় কাজ প্রচার করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। এই সময়ে নিজের আমলকে রক্ষা করা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং। তাই আমাদের উচিত, নিজেকে বড় ভাবার মানসিকতা পরিহার করা। সাধ্যমতো নিজের নেক আমলগুলো গোপন রাখা। মানুষের প্রশংসার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়া।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই অমূল্য উপদেশটি আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন— “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি তার নেক আমল গোপন রাখতে সক্ষম হয়, তবে সে যেন তা-ই করে।” (সিলসিলা সহিহাহ)
পরকালের পাথেয় হিসেবে সেই আমলটুকুই আমাদের কাজে আসবে, যা কেবল আল্লাহর জন্য সংরক্ষিত থাকবে।








