বিয়ে মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই মাহেন্দ্রক্ষণকে ঘিরে একেকজনের মানসিকতা একেক রকম। কেউ ঢাকঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানাতে ভালোবাসেন, আবার কেউ বিষয়টি একদম গোপন রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বিশেষ করে আমাদের সমাজে বিয়ের কথা পাকা হওয়ার আগে বিষয়টি গোপন রাখার একটি প্রবণতা দেখা যায়। এর পেছনে সামাজিক সম্মানের ভয় বা অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে।
তবে কৌতূহলের বিষয় হলো, বিয়ের প্রস্তাব এবং বিয়ের খবর প্রচারের ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি আসলে কী?
ইসলামি নীতি অনুযায়ী, বিয়ের আলোচনা চলাকালীন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত বিষয়টি গোপন রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। এ বিষয়ে হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন:
“তোমরা বিয়ের খবর প্রচার করো এবং বিয়ের প্রস্তাব গোপন রাখো।” (জামিউস সগির, হাদিস: ১১২২)
যদিও এই হাদিসের সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে কিঞ্চিৎ আলোচনা আছে, তবে এর মূল বার্তা অন্য অনেক সহিহ হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা সমর্থিত।
বিয়ের প্রস্তাব গোপন রাখার পেছনে অনেক সময় সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ থাকে। আলেমদের মতে, কোনো অশুভ শক্তি বা হিংসুক ব্যক্তির কুদৃষ্টি থেকে বাঁচতে গোপনীয়তা অবলম্বন করা মুস্তাহাব। সমাজতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে এর কয়েকটি কারণ হলো, অনেক সময় মন্দ স্বভাবের মানুষ ঈর্ষান্বিত হয়ে পাত্র-পাত্রীর নামে মিথ্যা অপবাদ রটনা করে বিয়ে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা তোমাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য গোপনীয়তার সাহায্য নাও, কারণ প্রতিটি নেয়ামত ভোগকারীর ওপরই হিংসা করা হয়।” (ফয়জুল কাদির, হাদিস: ৯৮৫)
বিয়ের প্রস্তাব গোপন রাখতে উৎসাহিত করা হলেও, বিয়ে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে লুকোচুরির কোনো স্থান ইসলামে নেই। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সময় তা ঘটা করে বা ঘোষণা দিয়ে সম্পন্ন করা সুন্নত। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় হয়। সামাজিকভাবে কোনো প্রকার ভুল বোঝাবুঝি বা সন্দেহের অবকাশ থাকে না। এর মাধ্যমে বংশপরম্পরা এবং উত্তরাধিকারের বিষয়টি স্বীকৃত হয়।
তিরমিজি শরিফের একটি হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, “তোমরা বিয়ের ঘোষণা দাও, তা মসজিদে সম্পন্ন করো এবং (খুশিতে) দফ বাজাও।” (হাদিস: ১০৮৯)
ইসলামি শরিয়ত মতে, বিয়ের ঘোষণার প্রধান অংশ হলো সাক্ষী রাখা। অধিকাংশ আলেমের মতে, সাক্ষী ছাড়া বিয়ে বৈধ হয় না। এছাড়া বিয়ের ঘোষণার আরও কিছু সুন্দর দিক হলো, বরকত ও প্রচারের উদ্দেশ্যে মসজিদে বিয়ে করা উত্তম। সাধ্য অনুযায়ী মানুষকে খাওয়ানো বা ওলিমার আয়োজন করা সুন্নাহ। পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের জানানো।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিয়ের আগের আলাপ-আলোচনা বা প্রস্তাব গোপন রাখা এবং বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর তা সবাইকে জানিয়ে দেওয়া—এটাই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ পথ। এটি যেমন ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা করে, তেমনি সামাজিক শৃঙ্খলাও বজায় রাখে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক বিধান মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।







