উচ্চশিক্ষার সনদ থাকলেই কি একজন মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠেন? নাকি দিন দিন আমাদের ডিগ্রি বাড়ছে, কিন্তু কমছে মানবিকতা? সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে এক বৃদ্ধা মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যুর ঘটনা সমাজকে এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যেখানে প্রতিটি সন্তান সুপ্রতিষ্ঠিত ও উচ্চশিক্ষিত, সেখানে মায়ের এমন পরিণতি ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে। কেন এই নৈতিক অবক্ষয়? আজ আমরা অনুসন্ধান করব আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পারিবারিক মূল্যবোধের এই সংকট নিয়ে।
আজকের সমাজব্যবস্থায় শিক্ষার মূল লক্ষ্য যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবল একটি ভালো চাকরি বা বৈষয়িক সাফল্য।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের যতটা ক্যারিয়ারমুখী ও ভোগবাদী হতে শেখায়, ততটা সহমর্মী বা দায়িত্বশীল হতে শেখায় না। নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুশাসনকে একপাশে সরিয়ে রেখে আমরা কেবলই ছুটে চলছি জাগতিক সফলতার পেছনে। ফলস্বরূপ, উচ্চশিক্ষার হার বাড়লেও সমাজ থেকে দূর হচ্ছে না নিষ্ঠুরতা আর আত্মকেন্দ্রিকতা।
এই সংকটের দায় কিন্তু অনেকাংশে পরিবার বা পিতা–মাতার ওপরও বর্তায়। “সন্তানকে বিপুল সম্পদের মালিক বানানোর চেয়ে, তাকে একজন সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা অনেক বেশি জরুরি।”
আমরা সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই এক প্রতিযোগিতার মাঠে নামিয়ে দিই। জিপিএ–৫ আর কর্পোরেট সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে তাদের শেখানো হয় না কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে বাবা–মায়ের প্রতি কর্তব্য পালন করতে হয়। মনে রাখা প্রয়োজন, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব থাকলে সন্তান হয়তো বিত্তশালী হবে, কিন্তু কখনো আত্মিক শান্তি পাবে না।
ইসলাম প্রতিটি মানুষকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল হতে নির্দেশ করেছে। প্রত্যেক মানুষই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। পিতা–মাতা তাদের সন্তানদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে, সন্তান জিজ্ঞাসিত হবে পিতা–মাতার হক আদায়ের ব্যাপারে। স্বামী তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে, স্ত্রীও জিজ্ঞাসিত হবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে। এভাবে প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।
যদি সমাজের প্রতিটি স্তরে মানুষ এই জবাবদিহিতার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারত, তবে বৃদ্ধাশ্রমগুলোর সংখ্যা এভাবে বাড়ত না, কিংবা কোনো মাকে নিঃসঙ্গ অবস্থায় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হতো না।
পবিত্র কোরআনের সূরা ফাতিরে বলা হয়েছে, ‘বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে’। অর্থাৎ, প্রকৃত জ্ঞানী তিনিই—যার ভেতর আল্লাহভীতি, সততা ও বিনয় রয়েছে।
কেবল মুখস্থ বিদ্যা বা ডিগ্রি অর্জন করলেই সমাজ বদলানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা যা মানুষের অন্তরে মানবিকতার আলো জ্বালাবে। যে শিক্ষা মানুষকে অন্যের দুঃখ অনুভব করতে শেখাবে, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস দেবে, সেটাই প্রকৃত শিক্ষা।
আসুন, সন্তানকে ডক্টরেট, ইঞ্জিনিয়ার বা বড় অফিসার বানানোর আগে একজন ভালো ‘মানুষ‘ হিসেবে গড়ে তুলি। কারণ নৈতিকতাহীন মেধা সমাজের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপ। শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হোক জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি উত্তম চরিত্র ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ। তবেই গড়ে উঠবে একটি সুন্দর পরিবার, নিরাপদ সমাজ ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র।








