সর্বশেষ
নিরাশার আঁধারে তওবার আলো: আল্লাহর রহমত ও ফিরে আসার গল্প
তারা নির্বাচনের আগে আমাকে হারিয়ে দিয়েছিল: মির্জা ফখরুল
শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় ৭ জুন
বিএসইসি চেয়ারম্যান ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
একের পর এক ধাক্কায় শাকিব খানের ‘রকস্টার’, মুক্তির সপ্তাহেই পাইরেসির থাবা
বেতন বন্ধ জুলাই ফাউন্ডেশনের কর্মীদের
প্রেম থেকেই কষ্ট পেয়েছিলাম: তৌসিফ মাহবুব
এভরিথিং ইজ ভেরি গুড
দেশে ফিরলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ব্যবসা ধসের মাশুল খেলাপি ঋণ
৩৬ হাজার টন বর্জ্য অপসারণ ডিএসসিসির
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা: মার্কিন ড্রোন ভূপাতিতের দাবি ইরানের
ট্রাম্পের শর্ত ছাড়া ইরানের সাথে কোনো চুক্তি নয়: হোয়াইট হাউস
৩২ লাখের কোরবানি: সমালোচনার জবাবে যা বললেন মন্ত্রীর ছেলে
দেশের ৭ অঞ্চলে ৮০ কিমি বেগে ঝড়ের পূর্বাভাস

নিরাশার আঁধারে তওবার আলো: আল্লাহর রহমত ও ফিরে আসার গল্প

মানুষ মাত্রই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। চলার পথে কখনো জেনে, আবার কখনো অজান্তেই আমরা জড়িয়ে পড়ি পাপের পঙ্কিলতায়। এটিই মানবজীবনের এক রূঢ় বাস্তবতা। তবে ইসলামের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, অপরাধের পাহাড় গড়ে তুললেও স্রষ্টার ক্ষমার দুয়ার কখনো হুট করে বন্ধ হয়ে যায় না। নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত প্রতিটা মুহূর্তই আসলে নতুন করে পথ চলার, অনুতপ্ত হওয়ার এবং নিজেকে শুধরে নেওয়ার এক অনন্য সুযোগ।

অনেকেই অতীতের ভুলের বোঝা টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন; ভাবেন, ‘আমার বুঝি আর ফেরার পথ নেই।’ কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর বাণী আমাদের অন্য এক আশার আলো দেখায়। বান্দা যখন খাঁটি অন্তরে অনুতপ্ত হয়ে মহান আল্লাহর দরবারে হাত তোলে, তখন তিনি কেবল ক্ষমা-ই করেন না, বরং তাকে পরম মমতায় রহমতের চাদরে জড়িয়ে নেন। তাই পাপের গ্লানিতে ডুবে যাওয়া নয়, বরং তওবার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আলোর পথে ফেরাই একজন মুমিনের আসল পরিচয়।

তওবাকারীর জন্য স্রষ্টার ভালোবাসা

ভুল মানুষের স্বভাবজাত বিষয়, কিন্তু সেই ভুলের পর অহংকার না করে স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ করাই প্রকৃত ইমানের লক্ষণ। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন—

أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

তারা কি তবে জানে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং তাদের সদকা গ্রহণ করেন? নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল দয়াময়।” (সূরা আত-তাওবা: ১০৪)

এই অমিয় বাণী স্পষ্ট করে দেয়, বান্দার চোখের জল ও আন্তরিক অনুশোচনা মহান আল্লাহর কাছে কতটা প্রিয়। তিনি সবসময়ই আমাদের ক্ষমা করার জন্য উদগ্রীব থাকেন।

আল্লাহর রহমতের মহাসমুদ্র

পাপের পাল্লা যত ভারীই হোক না কেন, তা কখনো আল্লাহর ক্ষমার চেয়ে বড় হতে পারে না। এই চরম সত্যটি ভুলে যাওয়া ইসলামের মূল ভাবধারার পরিপন্থী। সূরা আজ-জুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এক অভূতপূর্ব অভয়বাণী দিয়েছেন—

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

বলুন (হে নবী), আমার সেই বান্দারা—যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ হয়ো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল অতি দয়ালু।”

কুরআনের অন্যতম আশাজাগানিয়া এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ প্রতিটি পথহারা মানুষকে তাঁর ক্ষমার চাদরের নিচে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তওবার সময়সীমা কতদিন?

জীবন প্রদীপ কখন নিভে যাবে, তা আমাদের কারও জানা নেই। তাই তওবা করার সিদ্ধান্তকে ভবিষ্যতের খেরোখাতায় ফেলে রাখা চরম বোকামি। প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন—

إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ

আল্লাহ বান্দার তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করেন, যতক্ষণ না তার প্রাণ কণ্ঠাগত (মৃত্যুর মুখোমুখি) হয়।” (তিরমিজি: ৩৫৩৭)

সহজ কথায়, মৃত্যুর শেষ মুহূর্তটি ঘনিয়ে আসার আগেই আমাদের ফেরার কাজটি সেরে নিতে হবে।

খাঁটি তওবার আবশ্যিক শর্তসমূহ

ইসলামের পরিভাষায় তওবা মানে কেবল মুখে কিছু শব্দের উচ্চারণ নয়; বরং এটি জীবন পরিবর্তনের এক নীরব অঙ্গীকার। একটি তওবা পরিপূর্ণ হতে ৩টি মূল শর্ত পূরণ করতে হয়:

অতীতে ঘটে যাওয়া ভুলের জন্য মনের ভেতর তীব্র অনুশোচনা ও লজ্জাবোধ থাকতে হবে।যে পাপে লিপ্ত থাকা হয়েছিল, তা অবিলম্বে বর্জন করতে হবে এবং সেই পাপের পরিবেশ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে হবে।  ‘এই ভুল আর কখনোই করব না’—এমন একটি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা বুকে ধারণ করে সৎকাজের মাধ্যমে জীবন সাজাতে হবে।

মানুষের অধিকার বা ‘বান্দার হক’ নষ্ট হলে করণীয়

উপরের শর্তগুলো মূলত আল্লাহর অধিকারের (হকুল্লাহ) সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু অপরাধটি যদি কোনো মানুষের অধিকার (হককুল ইবাদ) হরণের সাথে যুক্ত থাকে—যেমন কারও সম্পদ আত্মসাৎ করা, কাউকে কষ্ট দেওয়া বা কারও প্রতি জুলুম করা—তবে শুধু আল্লাহর কাছে কাঁদলেই ক্ষমা মিলবে না। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩টি পদক্ষেপ আবশ্যক:

> ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

> তার পাওনা বা অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।

> প্রয়োজন হলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

এসব সম্পন্ন না হলে তওবা পূর্ণতা লাভ করে না।

এই সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা না মেটালে তওবার প্রক্রিয়াটি অপূর্ণই থেকে যায়।

তওবা যেন এক নতুন জন্ম

সঠিক নিয়মে তওবা করার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো, এটি মানুষের অতীত জীবনের সব কালিমোচন করে দেয়। মহানবী (সা.) এই বিষয়ে এক অনন্য সুসংবাদ দিয়েছেন—

التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ

পাপ থেকে তওবাকারী ব্যক্তি ঠিক ওই মানুষের মতো, যার কোনো গুনাহ-নেই।” (ইবনে মাজাহ: ৪২৫০)

একজন অপরাধী মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে! তওবার মাধ্যমে সে যেন এক নিষ্পাপ নতুন জীবনের লাইসেন্স পেয়ে যায়।

শয়তানের ফাঁদ: অতীতের স্মৃতি নিয়ে পড়ে থাকা

তওবা করার পরও অনেকে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে অতীতের ভুলগুলো ভেবে হতাশায় ভোগেন। ইসলামিক স্কলাররা এখানে একটি সুন্দর উদাহরণ দেন—

শিকারি কুকুরের তাড়া খাওয়া একটি হরিণ যদি দৌড়ানোর সময় বারবার পেছনের দিকে তাকায়, তবে স্বাভাবিকভাবেই তার গতি কমে যায় এবং সে সহজে শিকার হয়ে পড়ে।

একইভাবে, একজন মানুষ যদি তওবা করার পরও সারাক্ষণ অতীতের পাপের স্মৃতি নিয়ে পড়ে থাকে, তবে শয়তান তাকে আবারও হতাশায় ডুবিয়ে পূর্বের পাপের পথেই ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়।

তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তওবার আলোয় সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

গুনাহ হয়তো মানুষের এক মুহূর্তের দুর্বলতা, কিন্তু তওবা হলো মুমিনের আজীবনের শক্তি। স্রষ্টার ক্ষমার দরজা এতটাই বিশাল যে, সেখানে নিরাশার কোনো স্থান নেই। তাই অতীতের অন্ধকার অধ্যায় নিয়ে বসে না থেকে, আজই—এই মুহূর্তেই অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই হোক আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত। মনে রাখতে হবে, আমাদের পাপের পরিধি যত বড়ই হোক না কেন, আল্লাহর দয়া তার চেয়েও বহুগুণ বিশাল।

 

সম্পর্কিত খবর

এই পাতার আরও খবর

সর্বশেষ