দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো চরম শিক্ষকসংকটে পড়েছে। অর্ধেকের বেশি স্কুলে নেই প্রধান শিক্ষক। সেই সঙ্গে সহকারী শিক্ষকের হাজার হাজার পদ ফাঁকা থাকায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। বাড়তি ক্লাসের চাপ ও প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ দিতে পারছেন না কর্মরত শিক্ষকেরা। ফলে হু হু করে কমছে শিক্ষার মান, বাড়ছে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ঝুঁকি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টি স্কুলেই প্রধান শিক্ষকের পদ খালি।
বিভিন্ন জেলা ঘুরে পাওয়া গেছে প্রাথমিকের জরাজীর্ণ চিত্র। জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঁচটি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। এই একজন শিক্ষককেই স্কুলের ৭০ জন শিক্ষার্থীকে সামলানোর পাশাপাশি দাপ্তরিক সব ফাইলপত্র পরিচালনা করতে হচ্ছে। কুমিল্লা সদর উপজেলার উত্তর রসুলপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় এক দশক ধরে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। সেখানে দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে প্রতিদিন অন্তত তিনটি করে ক্লাস বাতিল করতে হচ্ছে বলে জানান ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা।
অঞ্চলের বৈষম্য ও শিখনফল বিপর্যয়
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘বার্ষিক খাতভিত্তিক কর্মসম্পাদন প্রতিবেদন ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশের ১২ হাজার ৯৩৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন চারজন বা তার চেয়ে কম। এর মধ্যে ১৩৩টি স্কুলে মাত্র একজন এবং ৬৩৩টি স্কুলে মাত্র দুজন শিক্ষক দিয়ে পুরো প্রতিষ্ঠান চালানো হচ্ছে। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে চট্টগ্রাম বা ঢাকায় বিদ্যালয়প্রতি গড় শিক্ষকসংখ্যা সাড়ে ছয়ের বেশি হলেও সিলেট ও বরিশালে তা পাঁচের কোটায়, যা শিক্ষার ভৌগোলিক বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
শিক্ষকসংকটের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের শিখনফলে। ‘জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ২০২২’ অনুযায়ী: তৃতীয় শ্রেণির গণিত ৬১% এবং পঞ্চম শ্রেণির ৭০% শিক্ষার্থী তাদের শ্রেণি-উপযোগী ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। তৃতীয় শ্রেণির বাংলা ৫১% এবং পঞ্চম শ্রেণির ৫০% শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় পড়ার দক্ষতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
জটিলতা কাটিয়ে সমাধানের আশ্বাস
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, নিয়োগ ও পদোন্নতির জ্যেষ্ঠতা-সংক্রান্ত ২০১৭ সালের একটি রিট পিটিশনের কারণেই এতদিন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ আটকে ছিল। সম্প্রতি আদালত আপিল রায়ে সেই জ্যেষ্ঠতা-সংক্রান্ত বাধা অপসারণ করেছেন। প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণে শিগগিরই সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) চাহিদাপত্র পাঠাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বর্তমান সংকট প্রসঙ্গে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, “আইনি জটিলতা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষকদের অনাগ্রহের কারণে বহুবছর ধরে এই সংকট জিইয়ে রাখা হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দুর্বল ও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা। দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক না ফেরাতে পারলে প্রাথমিকে শিখনঘাটতি দূর করা সম্ভব হবে না।”






