আজ ২৬শে এপ্রিল, বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস (World Intellectual Property Day)। ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশন’ (WIPO)-এর উদ্যোগে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— “IP and Sports: Ready, Set, Innovate” অর্থাৎ “আইপি এবং খেলাধুলা: প্রস্তুত, শুরু, উদ্ভাবন”। বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযথ গুরুত্বের সাথে ‘গ’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।
মেধাসম্পদ বা Intellectual Property শুধু আইনি সুরক্ষার বিষয় নয়, এটি মূলত মানুষের সৃজনশীল শ্রম বা ‘Intellectual Labor’-এর স্বীকৃতি। পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক এবং কপিরাইট সুরক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো উদ্ভাবক ও গবেষকদের মেধার মূল্যায়ন করা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—
“সত্য মূল্য না দিয়েই সাহিত্যের খ্যাতি করা চুরি। ভালো নয়, ভালো নয় নকল সে শৌখিন মজদুরি।”
অর্থাৎ পরের মেধা বা সৃষ্টিকে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া কেবল অনৈতিকই নয়, এটি সৃজনশীলতার পথে বড় অন্তরায়।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে ‘মেধা’ মহান আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত। সৃজনশীল এই শক্তির কারণেই মানুষ সৃষ্টির সেরা বা ‘আশরাফুল মাখলুকাত’। পবিত্র কোরআনের সূরা ইব্রাহিমের ৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহর নেয়ামতের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, মেধা তার অন্যতম। স্রষ্টা মানুষকে যে উদ্ভাবনী যোগ্যতা দিয়েছেন, তা অন্য কোনো প্রাণীর নেই।
আমরা বর্তমানে মেধার মাপকাঠিতে আইনস্টাইন, স্টিভ জবস বা জাকারবার্গকে গুরুত্ব দিলেও ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম বুখারি (রহ.) কিংবা ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর কালজয়ী মেধাকে অনেক সময় বিস্মৃত হই। অথচ তাঁরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে ভিত্তি গড়ে দিয়ে গেছেন, তা আজও বিশ্ব সভ্যতার আলোকবর্তিকা হয়ে আছে।
মেধা চর্চাকে ইসলাম সবসময় ইবাদত হিসেবে গণ্য করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই বিখ্যাত বাণী— “জ্ঞানের কথা জ্ঞানীর হারানো সম্পদ, যেখানেই তা পাবে তা গ্রহণ করার অধিকার তার আছে”—মুসলিম বিজ্ঞানীদের যুগান্তকারী সব আবিষ্কারে উদ্বুদ্ধ করেছে। ইতিহাসের পাতায় তাঁদের স্বাক্ষর আজও উজ্জ্বল:
- জাবির ইবনু হাইয়্যান: রসায়ন শাস্ত্রের জনক।
- ইবনু সিনা: আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পথিকৃৎ।
- আল-খাওয়ারিজমি: বীজগণিতের অসামান্য উদ্ভাবক।
- আল-বিরুনি: বিশ্বখ্যাত ভূগোল বিশারদ।
- ওমর খৈয়াম: জ্যামিতি ও গণিতের দিকপাল।
ইসলামি দর্শনে মেধা বিকাশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে: ১. ইলমুল ইয়াকিন: বিশ্বাসগত জ্ঞান। ২. আইনুল ইয়াকিন: চাক্ষুষ বা পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞান। ৩. হাক্কুল ইয়াকিন: পরম সত্যের জ্ঞান।
মেধাকে তুলনা করা হয়েছে খনিজ সম্পদের সাথে। ভূগর্ভস্থ স্বর্ণ বা রুপা যেমন আহরণ করতে হয়, মানুষের অন্তর্নিহিত মেধাকেও উপযুক্ত পরিচর্যা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বের করে আনতে হয়।
মেধাসম্পদ দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি মানুষের সৃষ্টিশীল সত্তাকে জাগ্রত করার দিন। পবিত্র কোরআনের ৭৫৬টি আয়াতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে বিশ্লেষণ রয়েছে, তা আমাদের প্রতিনিয়ত ভাবনার খোরাক দেয়। জ্ঞানীরাই প্রকৃত অর্থে স্রষ্টাকে অনুধাবন করতে পারেন। তাই উদ্ভাবন ও গবেষণার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের এই ধারায় মেধার সুরক্ষা এবং এর যথাযথ মূল্যায়নই হোক আজকের অঙ্গীকার।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ
কাপাসিয়া, গাজীপুর।






