প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা সেকেন্ডারি ইনকামে বড় প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও, সামষ্টিক অর্থনীতির বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে (বিওপি) নতুন চাপ তৈরি করছে ‘প্রাইমারি ইনকাম’ বা প্রাথমিক আয় খাত। এই খাতে আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় সামগ্রিক চলতি হিসাবে (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স) নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) প্রাথমিক আয় খাতে নিট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৩২ মিলিয়ন ডলার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই খাতের বহিরাগত আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যালেন্স অব পেমেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, প্রাইমারি ইনকাম খাতে মূলত তিনটি উৎস থেকে ডলার আসে, যা ‘ক্রেডিট’ হিসেবে জমা হয়। এগুলো হলো—বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ আন্তর্জাতিক বন্ড, মার্কিন ট্রেজারি ও বিদেশি ব্যাংকে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত সুদ-মুনাফা; স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কর্মজীবী ও সেবা খাতের আয়; এবং বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা শাখা বা ইক্যুইটি বিনিয়োগের লভ্যাংশ।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, এই তিনটি খাতের প্রতিটিতেই বর্তমানে দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যসহ জরুরি পণ্য আমদানির দায় মেটাতে রিজার্ভের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি লাভজনক বন্ডে খাটানো যাচ্ছে না। যেকোনো মুহূর্তে পেমেন্ট করার সুবিধার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাধ্য হয়ে ডলার ‘লিকুইডিটি ট্রাঞ্চ’ বা তরল আকারে ধরে রাখছে। ফলে উদ্বৃত্ত ডলারের অভাবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে কাঙ্ক্ষিত আয় আসছে না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল প্রান্তিকে প্রাথমিক আয় খাতে বাংলাদেশের মোট প্রাপ্তি বা ক্রেডিট ছিল মাত্র ২ হাজার ৩০৫ মিলিয়ন ডলার।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, আলোচ্য ১০ মাসে প্রাথমিক আয়ে ক্রেডিটের তুলনায় ডেবিট বা খরচের পরিমাণ হয়েছে প্রায় তিনগুণ। এই সময়ে দেশের রিজার্ভ থেকে দায় হিসেবে বেরিয়ে গেছে প্রায় ৬ হাজার ২৩৫ মিলিয়ন ডলার।
এই বিশাল ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ১ হাজার ৯৩৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে সরকারের বৈদেশিক ঋণের সুদ মেটাতে। ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত বছরগুলোতে নেওয়া কঠিন শর্তের স্বল্পমেয়াদি ও বাণিজ্যিক ঋণের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ (রেয়াতকাল) শেষ হয়ে আসায় অফিশিয়াল সুদের এই দায় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
সুদ পরিশোধের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের সুদ, বহুজাতিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা এবং শেয়ার বাজারে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড ও ক্যাপিটাল গেইনস নিজ দেশে নিয়ে যাওয়ার ফলেও ডেবিটের অঙ্ক বড় হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, বহুজাতিক কোম্পানি, করপোরেট হাউস ও মেগা প্রকল্পগুলোতে ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার বিশেষজ্ঞ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কাজ করছেন। আইএমএফের নিয়মানুযায়ী, এক বছরের কম সময়ের চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের পুরো বেতন-ভাতা এবং এক বছরের বেশি থাকা কর্মীদের বেতনের যে অংশটি অফিশিয়াল চ্যানেলে নিজ দেশে চলে যায়, তা এই খাতের সমীকরণে বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
একইভাবে বাংলাদেশে მოქმედ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বা এইচএসবিসির মতো বিদেশি ব্যাংক এবং মেটলাইফের মতো বিদেশি বিমা কোম্পানিগুলো এখানে ব্যবসা করে যে নিট মুনাফা পায়, তা যখন তাদের মূল হেডকোয়ার্টারে ফেরত পাঠায়, সেটিও প্রাইমারি ইনকামের ডেবিট লাইনকে ভারী করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মেগা প্রজেক্টের ঋণের সুদের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের সুদের হার এবং বিদেশি কর্মীদের পেছনে ডলারের বহিঃপ্রবাহ সম্মিলিতভাবে ডেবিটের পাল্লা বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ না থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স বড় ধরনের সংকটে পড়ত।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট থেকে বাঁচতে হলে মেগা প্রকল্পের জন্য চড়া সুদের স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়া দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। এর পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি এবং সহজ শর্তের ঋণের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। অন্যথায় রেমিট্যান্সের চোখ ধাঁধানো অর্জনও প্রাথমিক আয়ের এই বিশাল ঘাটতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।








