জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি রক্ষা এবং আহত-নিহত পরিবারের পুনর্বাসনের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’। তবে প্রতিষ্ঠার অল্প কিছুদিনের মাথায় এসে এক বড় ধরনের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তীব্র আর্থিক অনটনের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে এর নিয়মিত কার্যক্রম, আর বিগত দুই মাস ধরে বেতনহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন এখানকার ৩৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। ফলে, চাকরি ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকা অনুদানের মাধ্যমে এই ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সাধারণ মানুষের সহায়তায় মোট তহবিলের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৯ কোটি টাকা।
শুরুতে এই অর্থ দিয়ে এক হাজারের বেশি আহত ও শহীদ পরিবারকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়া হয়। বিশেষ করে গুরুতর আহতদের চোখ, হাত-পা ও স্নায়ুর জটিল অস্ত্রোপচার এবং থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিৎসার পেছনে একটি বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু এরপর বড় ধরনের কোনো নতুন সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান না আসায় চলতি বছরের শুরু থেকেই তহবিলে টান পড়ে। বর্তমানে ফাউন্ডেশনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট প্রায় শূন্যের কোঠায়।
ফাউন্ডেশনটির প্রতি মাসের অফিস খরচ প্রায় ১৬ লাখ টাকা, যার মধ্যে ১২ লাখ টাকাই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন। সরকারি তহবিল থেকে সর্বশেষ গত মার্চ মাসে কর্মীরা ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পেয়েছিলেন। এরপর আর কোনো ফান্ড আসেনি।
আসন্ন ঈদুল আজহার কথা চিন্তা করে ফাউন্ডেশনের সিইও (এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা) কামাল আকবর নিজের পেনশনের টাকা থেকে এপ্রিল মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ কোনো সুদ ছাড়াই ধার হিসেবে দিয়েছেন। কিন্তু মার্চ এবং মে মাসের বেতন এখনও বাকি। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে আনন্দের বদলে এখন শুধুই হতাশা। সিইও কামাল আকবর আক্ষেপ করে বলেন:
“এখানে যারা কাজ করছেন, তাদেরও পরিবার আছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে এক মাসের বেতন ধার দিয়েছি, কিন্তু তারপরও তাদের ঈদের বোনাসটা দিতে পারিনি।”
ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষের দাবি, বারবার সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করা সত্ত্বেও কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ও একজন শহীদ-মাতা সামসি আরা জামান সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
“মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এমন কেউ বসে আছেন, যিনি এই ফাউন্ডেশনকে ভেঙে দিতে চান। আমরা টাকার জন্য সব জায়গায় গিয়ে ব্যর্থ হয়েছি। সরকারের কোনো আন্তরিকতা দেখছি না।”
তিনি আরও জানান, গত ১৮ ও ১৯ মে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার কথা থাকলেও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর মন্ত্রী তাদের ফিরিয়ে দেন এবং ঈদের পরে আসার কথা বলেন। পরবর্তীতে তারা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এবং স্পিকারের শরণাপন্ন হলেও ফান্ড সংক্রান্ত জটিলতার কোনো সুরাহা হয়নি।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সিইও কামাল আকবর জানান, তারা এক অর্থবছরের বাজেট দিয়ে টানা দুই অর্থবছর পার করেছেন। নতুন অর্থবছর চলে এলেও কোনো বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না।
ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সামসি আরা জামান সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, জুলাই শহীদ ফাউন্ডেশনকে দুর্বল বা বন্ধ করে দেওয়া মানে প্রকারান্তরে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকেই আঘাত করা। কারণ, এই ফাউন্ডেশন আহত ও শহীদ পরিবারকে যে ধরনের বিশেষায়িত সেবা দিচ্ছে, তা সরকারের অন্য কোনো প্রচলিত দপ্তরের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। এদিকে দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় অফিসের ভেতরেও অভ্যন্তরীণ নানামুখী জটিলতা ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হচ্ছে।





