ইসলামে অলসতা বা অন্যের ওপর নির্ভরশীলতাকে কখনোই সমর্থন করা হয়নি; বরং পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে হালাল উপায়ে জীবিকা অন্বেষণে কঠোর পরিশ্রমের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইসলাম মনে করে, নিজের চেষ্টা ও শ্রম ছাড়া কোনো কিছু পাওয়ার স্বপ্ন দেখা অবান্তর।
পবিত্র কুরআনের সূরা আন–নাজমের ৩৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, “আর মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়।“
ধর্মীয় গবেষকদের মতে, দুনিয়াতে বেঁচে থাকার তাগিদে হালাল উপার্জনের লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালানো একজন মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত বা ইবাদতের পাশাপাশি বৈধ পন্থায় রুজি–রোজগার করাও এক ধরনের ইবাদত। পবিত্র কুরআনের সূরা জুমার ১০ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, “অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অনুসন্ধান করো এবং বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।“
রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বদা নিজ হাতে উপার্জনের গুরুত্ব অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। বুখারী শরীফের এক হাদিসে তিনি বলেছেন, “কোনো ব্যক্তি নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে আহার করতেন।“
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে কষ্ট করে নিজের আত্মসম্মান রক্ষা করা অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ রশি নিয়ে তার পিঠে কাঠের বোঝা বয়ে এনে তা বিক্রি করুক, যার ফলে আল্লাহ তার চেহারাকে (ভিক্ষা করার লাঞ্ছনা থেকে) রক্ষা করেন—তা মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে উত্তম, চাই তারা তাকে দিক বা না দিক।” (বুখারি: ১৪৭১)।
সাহাবায়ে কেরামের জীবন ছিল এই মহান শিক্ষার বাস্তব প্রতিচ্ছবি। মদিনায় হিজরতের পর বিখ্যাত সাহাবি হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) অতি সামান্য পুঁজি নিয়ে ঘি ও পনিরের ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেন। নিজের সততা, ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরবর্তীতে তিনি মুসলিম উম্মাহর অন্যতম সফল ও শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। একইভাবে খাব্বাব ইবনে আরাত্ত (রা.) ছিলেন একজন দক্ষ কামার, যিনি তলোয়ার তৈরির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আবার আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ইসলাম গ্রহণের আগে রাখাল হিসেবে কাজ করতেন। এসব নজির প্রমাণ করে, ইসলামে কোনো হালাল পেশাই ছোট নয়; বরং মর্যাদা নির্ভর করে কর্মের সততা ও উপার্জনের বৈধতার ওপর।
ইসলামী চিন্তাবিদরা বলছেন, হালাল পথে চলতে গেলে কখনো কখনো প্রতিকূল পরিস্থিতি বা ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতে পারে। তবে এতে হতাশ হয়ে দমে যাওয়া চলবে না। সাহাবি সাদ ইবনে আইয আল–ক্বারাজ (রা.)-এর জীবন থেকে জানা যায়, প্রথমদিকে তিনি বিভিন্ন ব্যবসায় বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েও হাল ছেড়ে দেননি। পরবর্তীতে নবীজি (সা.)-এর পরামর্শে চামড়ার (ক্বারাজ) ব্যবসা শুরু করে তিনি অভাবনীয় সফলতা লাভ করেন। এই ঘটনা শেখায়, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ধৈর্য সহকারে চেষ্টা করলে যেকোনো সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি হয়।
তবে হালাল উপার্জনের অর্থ এই নয় যে সবাইকে শুধু ব্যবসা বা কারিগরি পেশায় যুক্ত হতে হবে। সাহাবায়ে কেরামের কর্মজীবনে পেশাগত ব্যাপক বৈচিত্র্য ছিল। যেমন— হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) অত্যন্ত দক্ষ প্রশাসক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) বিচারক ও শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.) আমানতদার প্রশাসক হিসেবে উম্মাহর সেবা করেছেন। ফলে সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত প্রতিটি বৈধ পেশাই ইসলামে সমাদৃত।
বর্তমান সমাজে রাতারাতি ধনী হওয়ার মোহে অনেকের মধ্যেই হারাম উপার্জনের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেকেই ভাবেন, বর্তমান যুগে পুরোপুরি হালাল মেনে চলা অসম্ভব। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, উপার্জনের পরিমাণ কম হলেও যদি তা হালাল হয়, তবে তাতেই আল্লাহর প্রকৃত রহমত ও বরকত নিহিত থাকে। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত সততা ও আমানতদারিতাকে ধারণ করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে হালাল জীবিকা অর্জনে সচেষ্ট হওয়া।








